ইসরা ও মিরাজ নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জীবনের এক অসাধারণ সফরের দুটি অংশ। ইসরা অর্থ রাতের সফর—মক্কা থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত বলে পরিচিত বরকতময় আল-আকসা পর্যন্ত। মিরাজ অর্থ ঊর্ধ্বারোহণ—নবীর আসমানসমূহে আরোহণ। কুরআনে রাতের সফরের কথা আছে; হাদিসে, অর্থাৎ নবীর কথা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বর্ণিত বিবরণে, ঊর্ধ্বারোহণ এবং প্রতিদিন পাঁচবার নামাজের নির্দেশের বিস্তারিত পাওয়া যায়।
ইসরা ও মিরাজ বলতে কী বোঝায়?
কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ তাঁর বান্দাকে রাতে আল-মসজিদুল হারাম—মক্কার পবিত্র মসজিদ—থেকে আল-মসজিদুল আকসা—দূরতম মসজিদ—পর্যন্ত নিয়ে যান। এর চারপাশকে তিনি বরকতময় করেছেন; এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল তাঁকে আল্লাহর কিছু নিদর্শন দেখানো (Al-Isra 17:1)। মুসলিমরা আয়াতটিকে নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর জেরুজালেমে রাতের সফরের বিবরণ হিসেবে বোঝেন।
আয়াতটিতে সফরের প্রতিটি ধাপ বলা হয়নি। ঊর্ধ্বারোহণের বিবরণ এসেছে হাদিসে। কিছু মুসলিম আন-নাজমের দর্শনসংক্রান্ত আয়াতগুলোকেও মিরাজের সঙ্গে যুক্ত করেন, যদিও ওই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যায় মতভেদ আছে (An-Najm 53:13–18)।
সেই সফরে কী ঘটেছিল?
বর্ণনাগুলোতে দূরত্ব ও অভিজ্ঞতা—দুই দিক থেকেই এক অসাধারণ সফরের কথা আসে। বিভিন্ন বর্ণনায় কিছু বিবরণ ভিন্ন; সাধারণত মূল ঘটনাগুলো এভাবে বলা হয়:
- নবী ﷺ রাতে মক্কা থেকে জেরুজালেমে যান বুরাক নামের এক বাহনে, যার বর্ণনা হাদিসে আছে।
- তিনি আসমানসমূহে আরোহণ করেন এবং আদম, মুসা ও ইবরাহিমসহ আগের নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
- আল্লাহ তাঁর উম্মতের জন্য নামাজ নির্ধারণ করেন। প্রথমে দিনে পঞ্চাশবার নামাজের নির্দেশ ছিল; নবী ﷺ তা কমানোর আবেদন করার পর পাঁচবার নির্ধারিত হয়, তবে প্রতিদান থাকে পঞ্চাশবারের।
নামাজ নির্ধারণ ও সংখ্যা কমানোর বিবরণ রয়েছে (Sahih al-Bukhari 349)। তাই মুসলিমদের কাছে এ সফর শুধু বিস্ময়কর একটি ঘটনা নয়; তাঁদের প্রতিদিনের ইবাদতের ইতিহাসেরও অংশ।
এই কাহিনিতে আল-আকসা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কুরআন রাতের সফরের গন্তব্যের চারপাশকে বরকতময় বলেছে (Al-Isra 17:1)। আল-আকসাকে সেই গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করার ফলে মক্কার পবিত্র মসজিদ থেকে শুরু হওয়া সফরের সঙ্গে জেরুজালেম যুক্ত হয়। মুসলিমদের কাছে এ আয়াত আল-আকসাকে গভীর ধর্মীয় গুরুত্ব দেয়।
এ সফর বিভিন্ন যুগের নবীদের কাহিনিকেও যুক্ত করে। ঊর্ধ্বারোহণের বর্ণনায় আগের নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ মনে করিয়ে দেয় যে তাঁদের বার্তার সঙ্গে মুহাম্মদ ﷺ-এর বার্তার ধারাবাহিকতা আছে। তাই এ কাহিনি শুধু দূরের কোনো স্থানে পৌঁছানোর নয়; পবিত্র স্থান, নবীদের জীবন ও আল্লাহর ইবাদতও এর সঙ্গে জড়িত।
পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
সালাত বা নামাজ হলো নির্ধারিত সময়ে আদায় করা মুসলিমদের আনুষ্ঠানিক ইবাদত। মিরাজের বর্ণনায় নামাজের নির্দেশ একটি কেন্দ্রীয় ঘটনা: দৈনিক পঞ্চাশবার নামাজ কমিয়ে পাঁচবার করা হয়। মুসলিমরা দিনে পাঁচবার নামাজ পড়েন, পঞ্চাশবার নয়; হাদিসে এর প্রতিদান পঞ্চাশবারের সমান বলা হয়েছে (Sahih al-Bukhari 349)।
এ কারণেই মিরাজের কাহিনির সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনের সরাসরি সম্পর্ক আছে। নিজের এলাকার সময়সূচি জানতে আজকের নামাজের সময় দেখুন। নামাজের আগে দিক নির্ধারণে কিবলা কম্পাস ব্যবহার করতে পারেন।
ইসরা ও মিরাজ কখন ঘটেছিল?
অনেক মুসলিম সমাজে ইসলামী বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাস রজবের ২৭ তারিখের রাত ইসরা ও মিরাজের সঙ্গে যুক্ত। তবে কুরআন ও সফরের প্রধান বর্ণনাগুলোতে এই তারিখ প্রতিষ্ঠিত নয়। আলেমরা ভিন্ন ভিন্ন তারিখের কথা বলেছেন; তাই ২৭ রজবকে নিশ্চিত বার্ষিকী না বলে প্রচলিত ঐতিহ্য বলা বেশি যথাযথ।
১৪৪৮ হিজরির ২৭ রজব ২০২৭ সালের জানুয়ারির শুরুর দিকে পড়বে বলে প্রত্যাশিত। ইসলামী তারিখ সূর্যাস্তে শুরু হয়; স্থান ও চাঁদ দেখার পদ্ধতিভেদে তারিখ আলাদা হতে পারে। আপনার এলাকার তারিখ জানতে বিশ্বস্ত স্থানীয় সূত্র বা হিজরি ক্যালেন্ডার ও তারিখ রূপান্তরক দেখুন।
মুসলিমদের কি ২৭ রজব পালন করা উচিত?
এ বিষয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতভেদ আছে। কিছু সমাজে আলোচনা হয়, ঘটনাটি পাঠ করা হয়, কিংবা দিনটিকে নামাজ ও আত্মচিন্তার উৎসাহ হিসেবে নেওয়া হয়। অন্যদিকে, কিছু আলেম নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া ২৭ রজবকে প্রতিষ্ঠিত ধর্মীয় উৎসব মনে করা বা ওই রাতের জন্য বিশেষ ইবাদত নির্ধারণ করার বিষয়ে সতর্ক করেন।
পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ: সারা বছর এ সফর থেকে শিক্ষা নেওয়া এক বিষয়; নির্দিষ্ট কোনো পালনীয় কাজ আবশ্যক বলে দাবি করা আরেক বিষয়। সুন্নি ও জাফারি শিয়া সমাজের চর্চাতেও ভিন্নতা আছে। নিজের মসজিদে বা ঘরে কী করবেন, সে বিষয়ে বিশ্বস্ত স্থানীয় আলেম বা ইমামের পরামর্শ নিন।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ইসরা ও মিরাজ কি একই ঘটনা?
এগুলো একই সফরের পরস্পর-সংযুক্ত দুটি অংশের নাম। ইসরা হলো মক্কা থেকে জেরুজালেমে রাতের সফর; মিরাজ হলো আসমানসমূহে ঊর্ধ্বারোহণ।
রাতের সফরের কথা কি কুরআনে আছে?
হ্যাঁ। পবিত্র মসজিদ থেকে আল-মসজিদুল আকসা পর্যন্ত সফরের কথা কুরআনে আছে (Al-Isra 17:1)। আগের নবীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিবরণসহ পরিচিত অনেক বিস্তারিত এসেছে হাদিসে।
কুরআনে কি ইসরা ও মিরাজের তারিখ বলা হয়েছে?
না। কুরআনে রাতের সফরের কোনো বর্ষপঞ্জিগত তারিখ দেওয়া হয়নি। ২৭ রজবের সঙ্গে ঘটনাটি ব্যাপকভাবে যুক্ত হলেও সুনির্দিষ্ট তারিখ নিয়ে মতভেদ আছে।
পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো কেন?
হাদিসে আছে, নবী ﷺ বারবার নামাজের সংখ্যা কমানোর আবেদন করেন। শেষে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারিত হয়, কিন্তু প্রতিদান থাকে পঞ্চাশ ওয়াক্তের (Sahih al-Bukhari 349)। তাই মুসলিমরা দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন।
২৭ রজবের রাতে কি নির্দিষ্ট কোনো নামাজ পড়া আবশ্যক?
ওই রাতের জন্য নির্দিষ্ট, সর্বজনস্বীকৃত প্রতিষ্ঠিত কোনো নামাজ নেই। তারিখটি পালন করা নিয়েও আলেমদের মতভেদ আছে। কোনো বিশেষ আমল সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে বিশ্বস্ত স্থানীয় আলেম বা ইমামের পরামর্শ নিন।